একটি মুহূর্ত- শুধু একটি মুহূর্তই হতে পারে জীবনের মোড় ঘোরানোর জন্য যথেষ্ট। আমরা অনেকেই হার্ট অ্যাটাক আর হার্ট ফেলিওরের নাম শুনেছি, কিন্তু জানি কি, এই দুটি হৃদরোগ আসলে কতটা ভিন্ন? হৃদপিন্ড আমাদের শরীরের সেই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা প্রতিনিয়ত রক্ত সঞ্চালন করে শরীরের প্রতিটি কোষে প্রাণ সঞ্চার করে। কিন্তু এক মুহূর্তের দুর্বলতা বা ব্যর্থতায়, এটি আমাদের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে। আর তাই আমাদের সঠিকভাবে হার্ট সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি জানেন কি হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেলিওরের মধ্যে পার্থক্য কী?
কিছু মানুষ হার্ট অ্যাটাকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন, আবার কেউ কেউ হার্ট ফেলিওরকে সমান ভয়ানক মনে করেন। তবে অধিকাংশই মনে করেন, দুটি অবস্থা একই জিনিসের নাম। সত্য হলো, হার্ট অ্যাটাক আর হার্ট ফেলিওর একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি ঘটনার আকস্মিক আঘাত, যেখানে হৃদযন্ত্র অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে থাকে; অন্যটি হলো হৃদযন্ত্রের ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়া, যেখানে প্রতিনিয়ত এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়।
তাহলে এই দুটি শারীরিক সমস্যা কীভাবে আলাদা? কোন পরিস্থিতিতে হার্ট অ্যাটাক হয়, আর কখন তা রূপ নেয় হার্ট ফেলিওরে? আজকের এই আলোচনায় আমরা এই সকল বিষয়েই বিস্তারিত জানবো। তাই ভালোভাবে বুঝতে হলে পুরো আর্টিকেলটি মন দিয়ে পড়ুন।
হার্ট অ্যাটাক কী?
হার্ট অ্যাটাক, যাকে ডাক্তারি ভাষায় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial Infarction) বলা হয়, একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বা কমে যায়। রক্তের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে না পারলে হৃদপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, যা মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি আচমকা ঘটে থাকে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে জীবন হুমকির মুখে পড়ে।
হার্ট অ্যাটাকের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
হার্ট অ্যাটাক মূলত হৃদযন্ত্রের রক্ত সরবরাহে বাধার কারণে হয়। আমাদের হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহের জন্য ধমনী (coronary artery) থাকে, যা ব্লক হয়ে গেলে হৃদপেশির একটি অংশে অক্সিজেন পৌঁছায় না, ফলে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এটি যদি তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা না করা হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপেশি আর পুনরুদ্ধার হয় না এবং ফলস্বরূপ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের কারণসমূহ
ধমনীতে প্লাক জমে যাওয়া
হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ হলো করোনারি ধমনীগুলোতে প্লাক জমা হওয়া। প্লাক হলো চর্বি, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণ, যা ধমনীতে জমা হয়ে ধীরে ধীরে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াটিকে অ্যাথেরোসক্লেরোসিস (atherosclerosis) বলা হয়। যখন ধমনীতে প্লাক জমে যায়, তখন রক্ত চলাচল কমে যায় এবং হৃদযন্ত্রে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না, যা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।
রক্ত জমাট বাঁধা
ধমনীতে জমে থাকা প্লাকের ওপর কোনো কারণে ফাটল ধরলে বা প্লাক ভেঙে গেলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এই রক্ত জমাট পুরো ধমনীর পথ বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে হৃদযন্ত্রের কোনো অংশ অক্সিজেনের অভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এটি দ্রুত ঘটে এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
করোনারি স্পাজম
কখনো কখনো ধমনীগুলো কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই আকস্মিকভাবে সংকুচিত হতে পারে, যাকে করোনারি স্পাজম (coronary spasm) বলা হয়। এই সংকোচন রক্তের প্রবাহকে বন্ধ করে দিতে পারে এবং ফলে হার্ট অ্যাটাকের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণসমূহ
বুকে ব্যথা
হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড চাপ বা ব্যথা অনুভব করা। এটি সাধারণত চাপা বা জ্বালাপোড়া ধরনের ব্যথা হতে পারে, যা কাঁধ, হাত, পিঠ বা গলায় ছড়িয়ে যেতে পারে। এই ব্যথা কয়েক মিনিট ধরে থাকতে পারে বা বারবার ফিরে আসতে পারে।
শ্বাসকষ্ট
হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারলে শরীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এটি সাধারণত ব্যথার সঙ্গে একত্রে ঘটে থাকে, তবে কখনো কখনো শ্বাসকষ্টই হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র লক্ষণ হতে পারে।
ঘাম হওয়া
অনেক ক্ষেত্রে, হার্ট অ্যাটাকের সময় শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হতে পারে। শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার জন্য অত্যধিক ঘাম তৈরি করে, যা হৃদযন্ত্রের সমস্যা সংকেত দিতে পারে।
বমি বমি ভাব বা বমি
অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের সময় মানুষ বমি বমি অনুভব করে বা বমি করে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ লক্ষণ।
অসামঞ্জস্যতা ও দুর্বলতা
অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের সময় হঠাৎ করে শরীর দুর্বল হয়ে আসে, মাথা ঘোরা বা হালকা অসুস্থতা অনুভূত হতে পারে। এই ধরনের শারীরিক পরিবর্তনও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের জরুরি চিকিৎসা
তাৎক্ষণিক চিকিৎসা
হার্ট অ্যাটাকের সময় দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ অনুভব করেন, তবে যত দ্রুত সম্ভব ৯১১ বা অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করা উচিত। কোনো অবস্থাতেই সময় নষ্ট করা উচিত নয়। হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক চিকিৎসা যত দ্রুত হয়, তত বেশি জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা থাকে।
অ্যাসপিরিন গ্রহণ
চিকিৎসা নেওয়ার আগেই, একজন চিকিৎসক পরামর্শ অনুযায়ী অ্যাসপিরিন (Aspirin) চিবানো যেতে পারে। এটি রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে এবং রক্ত প্রবাহ সহজ করে।
ওষুধ ও থ্রম্বোলাইসিস
জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর, ডাক্তার সাধারণত রক্ত জমাট বাঁধা গলানোর জন্য থ্রম্বোলাইটিক ওষুধ দেন। এগুলো হার্টের ধমনীতে জমাট বাঁধা রক্তকে গলিয়ে দেয়, যাতে রক্ত প্রবাহ পুনরায় স্বাভাবিক হতে পারে।
অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি এবং স্টেন্টিং
যদি ওষুধ দ্বারা রক্ত প্রবাহ পুনরায় স্বাভাবিক করা না যায়, তবে ডাক্তাররা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি (angioplasty) করতে পারেন। এটি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ধমনীর ব্লকেজ সরানোর জন্য একটি বেলুনের মাধ্যমে ধমনীটি প্রসারিত করা হয় এবং মাঝে মাঝে সেখানে একটি স্টেন্ট বসানো হয়, যাতে ব্লকেজ পুনরায় না হয়।
করোনারি বাইপাস সার্জারি
অনেক সময় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা স্টেন্টিং কাজ না করলে বা ব্লকেজ খুব বেশি হলে, বাইপাস সার্জারি (bypass surgery) করা হতে পারে। এটি একটি শল্যচিকিৎসা, যার মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের ব্লক হয়ে থাকা ধমনীগুলোকে বাইপাস করে রক্ত চলাচল পুনরুদ্ধার করা হয়।
হার্ট অ্যাটাক জীবনের জন্য খুবই বিপজ্জনক, তবে সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চললে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। এই মারাত্মক অবস্থাকে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং জরুরি চিকিৎসার গুরুত্ব বুঝতে হবে।
হার্ট ফেলিওর কী?
হার্ট ফেলিওর, যাকে কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিওর (Congestive Heart Failure)ও বলা হয়, একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত অবস্থা যেখানে হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা তা সঠিকভাবে করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। হৃদপিণ্ডের কাজ হলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করা, কিন্তু হার্ট ফেলিওরের সময় সেই কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় না। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং শরীরে অতিরিক্ত তরল জমা হতে থাকে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, পা ফুলে যাওয়া এবং ক্লান্তি দেখা দেয়।
হার্ট ফেলিওরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
হার্ট ফেলিওর এমন একটি অবস্থা, যখন হৃদযন্ত্র তার পাম্পিং ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা তা কমে যায়। এটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্রমাগত খারাপ হতে পারে, যার ফলে শরীরে সঠিক পরিমাণে রক্ত সরবরাহ হয় না। প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষণগুলো খুব হালকা হতে পারে, তবে ধীরে ধীরে তা গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। হার্ট ফেলিওর সাধারণত হৃদযন্ত্রের অন্য কোনো সমস্যার ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় এবং এটি সম্পূর্ণরূপে নিরাময়যোগ্য নয়, তবে এর লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
হার্ট ফেলিওরের কারণসমূহ
হার্ট অ্যাটাক
পূর্বে হার্ট অ্যাটাক হওয়া হার্ট ফেলিওরের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি। হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদযন্ত্রের কিছু অংশ অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা মারা যায়, যার ফলে সেই অংশ রক্ত পাম্প করতে অক্ষম হয়। এর ফলে হৃদযন্ত্রের সাধারণ কার্যক্রম বিঘ্নিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেলিওর দেখা দিতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন)
উচ্চ রক্তচাপ হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিশ্রম করতে হয়, যা ধীরে ধীরে হৃদপেশি দুর্বল করে ফেলে এবং ফলস্বরূপ হার্ট ফেলিওর হতে পারে।
হৃদপিণ্ডের ভালভ সমস্যা
হৃদযন্ত্রের ভালভগুলোর সঠিকভাবে কাজ না করা হার্ট ফেলিওরের অন্যতম কারণ। ভালভের কাজ হলো রক্তকে সঠিকভাবে প্রবাহিত করতে সাহায্য করা। যদি ভালভে লিক বা সংকোচন হয়, তবে রক্ত প্রবাহে বাধা তৈরি হয় এবং হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমে যায়।
মায়োকার্ডাইটিস
মায়োকার্ডাইটিস হলো হৃদপেশির প্রদাহ, যা সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। এটি হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে এবং হার্ট ফেলিওরের কারণ হতে পারে। তরুণ বয়সেও মায়োকার্ডাইটিসের কারণে হার্ট ফেলিওর দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল এবং ড্রাগসের ব্যবহার
দীর্ঘমেয়াদী অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার হৃদপেশির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে তোলে, যার ফলে হার্ট ফেলিওর দেখা দিতে পারে।
হার্ট ফেলিওরের লক্ষণসমূহ
শ্বাসকষ্ট
হার্ট ফেলিওরের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট বা নিঃশ্বাসে কষ্ট হওয়া। হৃদযন্ত্র পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে না পারলে ফুসফুসে তরল জমতে শুরু করে, যা শ্বাস নিতে সমস্যা সৃষ্টি করে। শ্বাসকষ্ট সাধারণত শারীরিক পরিশ্রমের সময় শুরু হয়, তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।
পা ও পায়ের গোড়ালি ফুলে যাওয়া (এডিমা)
হার্ট ফেলিওরের সময় রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার কারণে শরীরে তরল জমতে শুরু করে, বিশেষ করে পা ও পায়ের গোড়ালিতে। অনেক সময় এডিমা এত বেশি হতে পারে যে চলাফেরায়ও সমস্যা হয়।
অত্যধিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
হার্ট ফেলিওরের রোগীরা সাধারণত তীব্র ক্লান্তি এবং দুর্বলতা অনুভব করে, কারণ হৃদপিণ্ড শরীরের বিভিন্ন অংশে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে অক্ষম হয়। ফলে শরীরের পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা হয়।
শুকনো কাশি বা ঘুমানোর সময় শ্বাস নিতে সমস্যা
হার্ট ফেলিওরের সময় অনেক সময় রোগীদের শুয়ে থাকা অবস্থায় শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে বা শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে। এটি বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় বেশি হয়, কারণ তরল জমা হওয়ার কারণে ফুসফুসে চাপ বৃদ্ধি পায়।
দ্রুত ওজন বৃদ্ধি
শরীরে তরল জমা হওয়ার ফলে অনেক সময় দ্রুত ওজন বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। এই ধরনের ওজন বৃদ্ধি হার্ট ফেলিওরের একটি গুরুতর লক্ষণ হতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।
হার্ট ফেলিওরের চিকিৎসা
লাইফস্টাইল পরিবর্তন
হার্ট ফেলিওর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হলো জীবনধারা পরিবর্তন করা। এর মধ্যে রয়েছে কম লবণযুক্ত খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, ধূমপান ও অ্যালকোহল ত্যাগ করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমাতে লবণ কম খাওয়াটা অত্যন্ত জরুরি, কারণ লবণ শরীরে পানি জমাতে সহায়তা করে, যা হার্ট ফেলিওরের লক্ষণগুলোকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ওষুধ
হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেলিওরের মধ্যে পার্থক্য যেমন রয়েছে তেমনি এসব সমস্যায় ওষুধও বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। ডাক্তাররা সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ওষুধের মাধ্যমে হার্ট ফেলিওরের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। ডাইইউরেটিকস (diuretics) ওষুধ শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল বের করতে সাহায্য করে। এছাড়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এ্যাসিই ইনহিবিটরস (ACE inhibitors) এবং বিটা-ব্লকার (Beta-blockers) ব্যবহার করা হয়। এন্টি-অ্যারিথমিক ওষুধও ব্যবহার করা হয় যদি হৃদযন্ত্রের রিদম ঠিক না থাকে।
কার্ডিয়াক রিসিনক্রোনাইজেশন থেরাপি (CRT)
এটি একটি বিশেষ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি, যা হার্ট ফেলিওর রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি একটি ছোট ডিভাইসের মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের ডান ও বাম অংশের রিদম ঠিক করে দেয়, যাতে হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা উন্নত হয়। CRT থেরাপি অনেক রোগীর জীবনমান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।
এলভিএডি (Left Ventricular Assist Device)
যদি হৃদযন্ত্রের অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয়, তবে ডাক্তাররা LVAD ডিভাইস লাগাতে পারেন। এটি একটি যান্ত্রিক পাম্প, যা হৃদপিণ্ডের পাম্পিং কার্যক্রমে সাহায্য করে। LVAD সাধারণত সেই রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হয়, যারা হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের জন্য অপেক্ষা করছেন।
হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট
যদি কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর না হয় এবং রোগীর অবস্থা মারাত্মক হয়, তবে শেষ পর্যায়ে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। এতে নতুন একটি সুস্থ হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করা হয়, যা রোগীর জীবন বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে।
হার্ট ফেলিওর একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং গুরুতর অবস্থা, তবে সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে এর লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সচেতনতা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা রোগীর জীবনমান উন্নত করতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেলিওর উভয়েরই জটিলতা
হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেলিওরের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও উভয়ই হৃদযন্ত্রের জন্য ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের ফলে হৃদপেশির কোনো একটি অংশ অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়, যা পরবর্তীতে সেই অংশের স্থায়ী ক্ষতি তৈরি করে। এই ক্ষতিগ্রস্ত পেশির কারণে হৃদযন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, যার ফলে হার্ট ফেলিওর দেখা দেয়। অন্যদিকে, হার্ট ফেলিওরের জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশে তরল জমে যাওয়া, ফুসফুসে পানি জমা, লিভার বা কিডনি অকেজো হয়ে পড়া। এছাড়াও, রক্তচাপ হঠাৎ করে কমে যাওয়া বা হৃদযন্ত্রের রিদমের গতি বিঘ্নিত হওয়া মারাত্মক জটিলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে। উভয় অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা না নিলে পরিস্থিতি জীবনহানির দিকে গড়াতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক হার্ট ফেলিওরের একটি কারণ হতে পারে
হার্ট অ্যাটাক একাধিক কারণে হার্ট ফেলিওরের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যখন হার্ট অ্যাটাক ঘটে, তখন হৃদপেশির একটি অংশ রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সেই অংশ মারা যায় বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমে যায়, কারণ অক্ষম পেশি রক্ত পাম্প করতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে এই ক্ষতির কারণে হৃদপিণ্ডের পাম্পিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং হার্ট ফেলিওরের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে হলেও, একটি সাধারণ হার্ট অ্যাটাক পরবর্তীতে হৃদপিণ্ডকে দুর্বল করে ফেলে এবং রোগীকে হার্ট ফেলিওরের দিকে নিয়ে যায়।
হার্ট ফেলিওরের বিভিন্ন পর্যায়
হার্ট ফেলিওর মূলত চারটি পর্যায়ে বিভক্ত, যার প্রতিটি পর্যায় হৃদযন্ত্রের অবস্থা ক্রমশ অবনতি করে। প্রথম পর্যায়ে, রোগীর কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে, তবে হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে শ্বাসকষ্ট বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তৃতীয় পর্যায়ে, কিছুটা শারীরিক পরিশ্রমেই লক্ষণগুলো প্রকট আকার ধারণ করে, যেমন হাঁটা বা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া। চতুর্থ ও শেষ পর্যায়ে, রোগী সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকলেও শ্বাসকষ্ট, পা ফুলে যাওয়া বা ক্লান্তি অনুভব করতে পারে। প্রতিটি পর্যায়ে চিকিৎসা এবং জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে লক্ষণগুলো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও, শেষ পর্যায়ে হার্ট ফেলিওর গুরুতর আকার ধারণ করে, যা জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
উপসংহার
হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেলিওরের মধ্যে পার্থক্য কী – আশা করি আপনি যেহেতু এতদূর পর্যন্ত পড়ে ফেলেছেন, এই প্রশ্নের উত্তরও আপনার কাছে এখন পানির মত পরিষ্কার। মূলত দুটিই ভয়াবহ হৃদরোগ এবং জীবনকে থমকে দিতে পারে। তবে এই দুটি অবস্থার প্রকৃতি, কারণ এবং প্রতিকারের ধরন ভিন্ন। হার্ট অ্যাটাক একটি আকস্মিক আঘাত, যেখানে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু ঝুঁকি তীব্র হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, হার্ট ফেলিওর হলো হৃদযন্ত্রের ক্রমাগত দুর্বলতা, যা সময়ের সাথে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। তবে, দুটি অবস্থাই আমাদেরকে একটি বিষয় শিখিয়ে যায়- সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। আমরা আমাদের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে এই মারাত্মক রোগগুলো প্রতিরোধ করতে পারি। হৃদয়ের সুস্থতা কেবল আমাদের দৈহিক শক্তি নয়, আমাদের মানসিক শান্তি এবং দীর্ঘায়ুর সঙ্গীও। জীবন একটাই, আর এই জীবনের প্রতিটি স্পন্দন যেন আমাদের হৃদয়ের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে। হার্টের যত্ন নেওয়া মানেই জীবনকে ভালোবাসা।